মৃত ব্যক্তির ভোটার আইডি কার্ড কীভাবে বাতিল করবেন এবং কেন এটি জরুরি?
পরিবারের কেউ মারা গেলে তার এনআইডি বা ভোটার আইডি কার্ড বাতিল করা আইনি ও নিরাপত্তার স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি। মৃত ব্যক্তির এনআইডি কার্ড বাতিলের সঠিক নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং এর গুরুত্ব বিস্তারিত জেনে নিন।
পরিবারের আপন কোনো সদস্য মারা গেলে স্বজনরা স্বাভাবিকভাবেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কিন্তু শোকের এই সময়ের মধ্যেও আমাদের কিছু নাগরিক ও আইনি দায়িত্ব পালন করতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হলো মৃত ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র বা ভোটার আইডি কার্ড (NID) বাতিল করা।
আমাদের দেশে অনেকেই প্রিয়জনের মৃত্যুর পর তার ভোটার আইডি কার্ডটি যত্ন করে তুলে রাখেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে তা বাতিল করার কথা ভাবেন না। এটি পরবর্তীতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। চলুন জেনে নিই কেন এটি জরুরি এবং কীভাবে খুব সহজেই এই কাজটি করা যায়।
মৃত ব্যক্তির ভোটার আইডি কার্ড বাতিল করা কেন জরুরি?
মৃত ব্যক্তির এনআইডি কার্ড বাতিল না করলে বেশ কিছু সমস্যা ও জালিয়াতির ঝুঁকি থেকে যায়। নিচে প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো:
-
পরিচয় জালিয়াতি রোধ: অসাধু চক্র মৃত ব্যক্তির ভোটার আইডি কার্ড ব্যবহার করে জমি রেজিস্ট্রি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বা লোন তোলার মতো বড় ধরনের জালিয়াতি করতে পারে। কার্ড বাতিল করা হলে সার্ভারে তার স্ট্যাটাস 'মৃত' দেখাবে, ফলে এই ধরনের জালিয়াতি অসম্ভব হয়ে যাবে।
-
ভুয়া ভোট প্রতিরোধ: নির্বাচনের সময় মৃত ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকায় থেকে গেলে অন্যের দ্বারা ভুয়া ভোট (Proxy Vote) দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ থাকা অপরিহার্য।
-
উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টন: মৃত ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টের টাকা তোলা বা রেখে যাওয়া সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করার জন্য উত্তরাধিকার সনদ (Succession Certificate) প্রয়োজন হয়। আইনি এই প্রক্রিয়াগুলো সহজ করতে মৃত ব্যক্তির এনআইডি কার্ড নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে বাতিল বা আপডেট থাকা প্রয়োজন।
এনআইডি কার্ড বাতিল করতে কী কী কাগজপত্র লাগবে?
মৃত ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে কর্তন বা কার্ড বাতিলের জন্য খুব বেশি কাগজের প্রয়োজন হয় না। নিচের ডকুমেন্টসগুলো প্রস্তুত রাখুন:
১. মৃত ব্যক্তির মূল ভোটার আইডি কার্ড (স্মার্ট কার্ড বা কাগজের কার্ড)। ২. ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন থেকে ইস্যু করা নিবন্ধিত মৃত্যু সনদ (Death Certificate)। ৩. আবেদনকারীর (যিনি বাতিল করার আবেদন করছেন) ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি। ৪. মৃত ব্যক্তির সাথে আবেদনকারীর সম্পর্ক প্রমাণের জন্য ওয়ারিশ সনদ বা চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র (অনেক সময় প্রয়োজন হতে পারে)।
কার্ড বাতিল করার পদ্ধতি
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির কার্ড বাতিলের প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। নিচে ধাপে ধাপে নিয়মটি আলোচনা করা হলো:
ধাপ ১: ফর্ম সংগ্রহ প্রথমে আপনাকে 'ফর্ম ১২' (Form 12) সংগ্রহ করতে হবে। এটি মূলত ভোটার তালিকা হতে নাম কর্তনের আবেদন ফর্ম। আপনি চাইলে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (nidw.gov.bd) থেকে এই ফর্মটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিতে পারেন। অথবা আপনার স্থানীয় উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিস থেকেও বিনামূল্যে এটি সংগ্রহ করতে পারবেন।
ধাপ ২: ফর্ম পূরণ ফর্ম ১২-তে মৃত ব্যক্তির নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্ম তারিখ এবং মৃত্যুর তারিখ সঠিকভাবে পূরণ করুন। এর পাশাপাশি যিনি আবেদন করছেন, তার নাম, ঠিকানা এবং স্বাক্ষর ফর্মে দিতে হবে।
ধাপ ৩: কাগজপত্র সংযুক্ত করা পূরণকৃত ফর্মটির সাথে আগেই উল্লেখ করা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো (মৃত্যু সনদ, মূল এনআইডি কার্ড এবং আবেদনকারীর এনআইডির কপি) একসাথে পিন আপ বা সংযুক্ত করুন।
ধাপ ৪: অফিসে জমা দেওয়া সবকিছু ঠিক থাকলে আপনার নিজ উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদনপত্রটি জমা দিন।
পরবর্তী পদক্ষেপ: নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তারা আপনার দেওয়া তথ্য এবং মৃত্যু সনদ যাচাই-বাছাই করবেন। সবকিছু সঠিক প্রমাণিত হলে তারা সার্ভার থেকে মৃত ব্যক্তির নাম ভোটার তালিকা থেকে স্থায়ীভাবে মুছে ফেলবেন এবং তার এনআইডি কার্ডটি নিষ্ক্রিয় (Inactive) করে দেবেন।
পরিবারের কোনো সদস্য মারা যাওয়ার পর তার মৃত্যু নিবন্ধন করা এবং ভোটার আইডি কার্ড বাতিল করা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। এতে মৃত ব্যক্তির পরিচয় যেমন সুরক্ষিত থাকে, তেমনি রাষ্ট্রও একটি পরিচ্ছন্ন ডেটাবেস বজায় রাখতে পারে। তাই অবহেলা না করে সময়মতো এই কাজটি সম্পন্ন করা উচিত।
Share
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0