একই ব্যক্তির দুইবার ভোটার হলে (দ্বৈত ভোটার) জেল-জরিমানা ও সমাধানের উপায়
ভুল করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে দুইবার ভোটার হয়েছেন? দ্বৈত ভোটার হলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন অনুযায়ী কী শাস্তি বা জরিমানা হতে পারে এবং কীভাবে এর সমাধান করবেন, তা বিস্তারিত জানুন।
বাংলাদেশে অনেকেই না বুঝে বা ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একই ব্যক্তির দুইবার ভোটার হওয়ার মতো ভুলটি করে বসেন। যাকে নির্বাচন কমিশনের ভাষায় ‘দ্বৈত ভোটার’ বলা হয়। অনেকে ভাবেন, আগের ভোটার আইডি কার্ড (NID) হারিয়ে গেছে বা সেখানে নামের বানান ভুল আছে, তাই নতুন করে আবার ভোটার হওয়াটাই বোধহয় সবচেয়ে সহজ উপায়।
কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে একবার আপনার আঙুলের ছাপ যুক্ত হয়ে গেলে, দ্বিতীয়বার ভোটার হতে গেলেই আপনি ‘দ্বৈত ভোটার’ হিসেবে ধরা পড়বেন। আজকের এই লেখায় আমরা জানব, দুইবার ভোটার হলে আইনে কী ধরনের শাস্তির বিধান আছে এবং কীভাবে সঠিক উপায়ে এই সমস্যার সমাধান করা যায়।
দ্বৈত ভোটার কেন হয়?
সাধারণত কয়েকটি কারণে মানুষ দ্বৈত ভোটার হয়ে থাকেন:
-
আগে ভোটার হয়েছেন কিন্তু কোনো কারণে এনআইডি কার্ড হাতে পাননি, তাই নতুন করে আবার ছবি ও আঙুলের ছাপ দিয়েছেন।
-
বয়স কমানো বা নাম পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বিতীয়বার তথ্য গোপন করে ভোটার হয়েছেন।
-
এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার পর, আগের এলাকার কথা গোপন করে নতুন এলাকায় ভোটার হয়েছেন।
দ্বৈত ভোটার হলে জেল ও জরিমানা (আইনি শাস্তি)
বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র বা ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। আপনি যদি তথ্য গোপন করে বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে দুইবার ভোটার হন, তবে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০১০-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী: যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বা জেনেশুনে একাধিক জাতীয় পরিচয়পত্র নেন বা একাধিকবার ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেন, তবে তার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। এই অপরাধের জন্য একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের ডাটাবেজে এএফআইএস (AFIS - Automated Fingerprint Identification System) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। ফলে কেউ দ্বিতীয়বার আঙুলের ছাপ দিলেই সার্ভার তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্লক করে দেয়। তখন ওই ব্যক্তির আগের এবং নতুন—উভয় এনআইডি কার্ডই লক (Lock) হয়ে যায়।
কীভাবে বুঝবেন আপনি দ্বৈত ভোটার হয়েছেন?
-
স্মার্ট কার্ড বা অনলাইন কপি ডাউনলোড করতে গেলে স্ট্যাটাসে "Lock" বা "Dual Voter" লেখা দেখায়।
-
নতুন ভোটার হওয়ার পর আপনার মোবাইলে মেসেজ আসতে পারে যে, আপনার আঙুলের ছাপ অন্য কারও তথ্যের সাথে মিলে গেছে।
-
নির্বাচন অফিস থেকে আপনাকে সরাসরি চিঠি বা নোটিশ পাঠিয়ে দ্বৈত ভোটারের বিষয়টি জানানো হতে পারে।
দ্বৈত ভোটার সমস্যার সমাধানের উপায়
দুইবার ভোটার হয়ে গেলে ভয় পেয়ে লুকিয়ে থাকার কিছু নেই। আপনি যদি ভুল করে এই কাজটি করে থাকেন, তবে নির্বাচন কমিশনে সঠিক প্রক্রিয়ায় আবেদন করে এর সমাধান করা সম্ভব। এর জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
১. উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ
প্রথমেই আপনার বর্তমান বা স্থায়ী ঠিকানার উপজেলা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। সেখানে দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে খুলে বলুন যে আপনি না বুঝে বা ভুলবশত দুইবার ভোটার হয়েছেন।
২. ক্ষমা প্রার্থনা করে লিখিত আবেদন
আপনাকে উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার (অথবা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের) বরাবর একটি লিখিত আবেদন করতে হবে। এই আবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে কেন আপনি দুইবার ভোটার হয়েছেন এবং এর জন্য আপনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত (ক্ষমা প্রার্থনা)।
৩. নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ (ফর্ম-৭)
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাতিলের জন্য নির্বাচন কমিশনের একটি নির্দিষ্ট ফর্ম আছে (সাধারণত ফর্ম-৭ ব্যবহার করা হয়)। এই ফর্মটি পূরণ করে জমা দিতে হবে। আপনার উদ্দেশ্য হবে, যেকোনো একটি তথ্য (সাধারণত পরের বার দেওয়া ভুল তথ্যটি) বাতিল করে আগের বা সঠিক তথ্যটি বহাল রাখা।
৪. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা
আবেদনের সাথে কিছু দরকারি কাগজ যুক্ত করতে হবে:
-
আপনার প্রথম ও দ্বিতীয়বার ভোটার হওয়ার স্লিপ বা এনআইডি কার্ডের কপি (যদি থাকে)।
-
ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশন থেকে নেওয়া নাগরিকত্ব সনদ।
-
জন্মনিবন্ধন সনদ বা শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের কপি।
-
পিতা-মাতার এনআইডি কার্ডের কপি।
৫. শুনানি ও নিষ্পত্তি
কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর নির্বাচন অফিস থেকে আপনাকে একটি শুনানির (Hearing) তারিখ দেওয়া হবে। ওই নির্দিষ্ট দিনে আপনাকে সশরীরে উপস্থিত হতে হবে। কর্মকর্তা আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারেন। সেখানে কোনো তথ্য গোপন না করে সত্য ঘটনাটি বলে দেবেন।
আপনার বক্তব্য এবং কাগজপত্র ঠিক থাকলে, নির্বাচন কমিশন আপনার দ্বিতীয় বা ভুল এনআইডি কার্ডটি বাতিল করে দেবে এবং আপনার মূল বা সঠিক কার্ডটির ওপর থেকে "লক" বা ব্লক তুলে নেবে।
কিছু জরুরি পরামর্শ
-
দালাল থেকে সাবধান: এই কাজটি করার জন্য কোনো দালালের শরণাপন্ন হবেন না। দালালরা টাকা নিয়ে অনেক সময় ভুয়া কাগজ জমা দেয়, যা আপনাকে আরও বড় আইনি ঝামেলায় ফেলতে পারে।
-
তথ্য গোপন করবেন না: নির্বাচন অফিসে শুনানির সময় বা আবেদনপত্রে কোনোভাবেই মিথ্যা তথ্য দেবেন না। নিজের ভুল স্বীকার করে নেওয়াই এই সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে সহজ উপায়।
-
এনআইডি সংশোধন: যদি আপনার আগের কার্ডে কোনো ভুল থাকে, তবে নতুন করে ভোটার না হয়ে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে অনলাইনে সংশোধনের আবেদন করুন।
একই ব্যক্তির দুইবার ভোটার হওয়া কোনো সাধারণ বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের চোখে একটি অপরাধ। তাই যারা নতুন ভোটার হচ্ছেন, তারা অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিন যে আপনি অতীতে কখনো ভোটার তথ্য বা আঙুলের ছাপ দিয়েছিলেন কি না। আর যারা ইতোমধ্যে দ্বৈত ভোটার হয়ে বিপাকে আছেন, তারা দেরি না করে আজই আপনার নিকটস্থ উপজেলা নির্বাচন অফিসে গিয়ে সমাধানের প্রক্রিয়া শুরু করুন।
Share
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0