অনলাইনে নতুন ভোটার আইডি কার্ড করার নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ২০২৪
অনলাইনে নতুন ভোটার আইডি কার্ড করার সহজ নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজের তালিকা জানুন। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের বাংলাদেশিরা কীভাবে আবেদন করবেন তার পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন।
বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি (NID) কার্ড শুধুমাত্র ভোট দেওয়ার জন্যই নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় দলিল। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে পাসপোর্ট করা, জমি কেনা-বেচা এমনকি সরকারি বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতে গেলেও এনআইডি কার্ডের প্রয়োজন হয়।
আপনার বয়স যদি ১৮ বছর বা তার বেশি হয়ে থাকে এবং আপনি এখনও ভোটার না হয়ে থাকেন, তবে খুব সহজেই এখন ঘরে বসে অনলাইনে ভোটার নিবন্ধনের আবেদন করতে পারবেন। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা একদম সহজ ভাষায় জানব অনলাইনে নতুন ভোটার আইডি কার্ড করার নিয়ম এবং এর জন্য কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন।
নতুন ভোটার হওয়ার যোগ্যতা
নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার জন্য আপনাকে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে:
১. বয়স: আপনার বয়স অবশ্যই ১৮ বছর বা তার বেশি হতে হবে (সাধারণত ০১ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে যাদের বয়স ১৮ হয়েছে)। ২. নাগরিকত্ব: আপনাকে অবশ্যই জন্মসূত্রে বা আইনত বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। ৩. ভোটার এলাকা: আপনি যে এলাকায় বসবাস করেন, সেই এলাকার ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করতে হবে।
প্রয়োজনীয় কাগজের তালিকা
অনলাইনে আবেদনের সময় এবং পরবর্তীতে নির্বাচন অফিসে জমা দেওয়ার জন্য কিছু কাগজের স্ক্যান কপি এবং মূল কপি প্রয়োজন হয়। ভুল তথ্য দেওয়া এড়াতে কাগজপত্রগুলো আগে থেকেই গুছিয়ে রাখা ভালো।
সাধারণ নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
-
অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ (Digital Birth Certificate): এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্যই ১৭ ডিজিটের অনলাইন যাচাইকৃত জন্ম সনদ হতে হবে। হাতে লেখা জন্ম সনদ গ্রহণযোগ্য নয়।
-
শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ: আপনি যদি পড়াশোনা করে থাকেন, তবে এসএসসি (SSC), জেএসসি (JSC) বা সমমানের পরীক্ষার সার্টিফিকেটের কপি। এটি আপনার জন্ম তারিখ ও নামের সঠিক বানান যাচাই করতে সাহায্য করে।
-
পিতা ও মাতার এনআইডি কার্ডের কপি: পিতা এবং মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি প্রয়োজন হবে। যদি তারা মৃত হন, তবে তাদের এনআইডি নম্বর এবং মৃত হলে মৃত্যু সনদ লাগতে পারে।
-
ঠিকানার প্রমাণপত্র: আপনি যে এলাকায় ভোটার হতে চান, সেখানে বসবাসের প্রমাণ হিসেবে নিচের যেকোনো একটির কপি:
-
বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল বা পানির বিলের কপি (যেকোনো এক মাসের)।
-
বাড়ির কর (Holding Tax) দেওয়ার রশিদ।
-
বাড়ির দলিল বা ভাড়াটিয়া হলে ভাড়ার চুক্তিনামা।
-
-
রক্তের গ্রুপের রিপোর্ট: আপনার রক্তের গ্রুপ নিশ্চিত করার জন্য কোনো প্যাথলজি ল্যাব থেকে প্রাপ্ত রিপোর্ট।
-
নাগরিকত্ব সনদ: আপনি যে ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার বাসিন্দা, সেখানকার চেয়ারম্যান, মেয়র বা ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত নাগরিকত্ব সনদপত্র।
বিবাহিতদের জন্য অতিরিক্ত কাগজপত্র (যদি প্রযোজ্য হয়):
-
স্বামী বা স্ত্রীর এনআইডি কার্ডের কপি।
-
কাবিননামা বা বিবাহ নিবন্ধন সনদ।
অনলাইনে আবেদন করার ধাপসমূহ
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (Bangladesh Election Commission) অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ব্যবহার করে আপনি আবেদন করতে পারবেন। নিচে ধাপগুলো দেওয়া হলো:
ধাপ ১: রেজিস্ট্রেশন ও অ্যাকাউন্ট তৈরি
প্রথমে নির্বাচন কমিশনের এনআইডি উইং-এর অফিসিয়াল সাইটে (
-
আপনার সম্পূর্ণ নাম (জন্ম সনদ অনুযায়ী), জন্ম তারিখ এবং মোবাইল নম্বর দিন।
-
ফোনে একটি ওটিপি (OTP) আসবে, সেটি দিয়ে মোবাইল নম্বরটি ভেরিফাই করুন।
-
একটি ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড সেট করে আপনার অ্যাকাউন্টটি সুরক্ষিত করুন।
ধাপ ২: ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ
লগ-ইন করার পর আপনাকে একটি অনলাইন ফরম পূরণ করতে হবে। এখানে সতর্কতার সাথে আপনার সঠিক তথ্যগুলো লিখুন:
-
ব্যক্তিগত তথ্য: আপনার নাম (বাংলা ও ইংরেজিতে), লিঙ্গ, রক্তের গ্রুপ, জন্মস্থান ইত্যাদি।
-
পরিবার সংক্রান্ত তথ্য: পিতা ও মাতার নাম, তাদের এনআইডি নম্বর। স্বামী/স্ত্রী থাকলে তাদের তথ্য।
-
শিক্ষাগত যোগ্যতা: আপনার সর্বোচ্চ ডিগ্রি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম।
ধাপ ৩: ঠিকানা ও ভোটার এলাকা নির্বাচন
আপনার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা সঠিকভাবে পূরণ করুন। এরপর "ভোটার এলাকা" নির্বাচন করতে হবে। আপনি যে ঠিকানায় ভোটার হতে চান, সেটি সতর্কতার সাথে সিলেক্ট করুন।
ধাপ ৪: কাগজপত্র আপলোড ও সাবমিট
সব তথ্য পূরণ করার পর আপনার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (পূর্বেই স্ক্যান করে রাখা) আপলোড করার অপশন আসবে। আপনার জন্ম সনদ, এনআইডি কপি এবং ঠিকানার প্রমাণপত্র আপলোড করুন।
সবশেষে আপনার দেওয়া তথ্যগুলো ভালো করে রিভিউ বা চেক করুন। যদি সব ঠিক থাকে, তবে "সাবমিট" করুন। সাবমিট করার পর একটি আবেদন ফরম (Form-2) পিডিএফ আকারে ডাউনলোড করার সুযোগ পাবেন। এটি প্রিন্ট করে সংরক্ষণ করুন।
পরবর্তী করণীয় (বায়োমেট্রিক ও এনআইডি সংগ্রহ)
অনলাইনে আবেদন সাবমিট করলেই আপনার কাজ শেষ নয়। এনআইডি কার্ড হাতে পেতে আপনাকে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
১. মেসেজের অপেক্ষা: আপনার আবেদনটি প্রাথমিক যাচাইয়ের পর আপনার মোবাইল নম্বরে একটি এসএমএস আসবে। যেখানে বলা হবে কখন আপনার ছবি তোলা ও আঙুলের ছাপ (বায়োমেট্রিক) দেওয়ার জন্য নির্বাচন অফিসে যেতে হবে। ২. অফিসে উপস্থিত হওয়া: নির্ধারিত তারিখে আপনার ডাউনলোড করা আবেদন ফরমটি এবং প্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজের মূল কপি (Original Documents) এবং একসেট সত্যায়িত ফটোকপি নিয়ে উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে উপস্থিত হোন। ৩. বায়োমেট্রিক প্রদান: অফিসে আপনার ছবি তোলা হবে, ১০ আঙুলের ছাপ এবং চোখের আইরিশ স্ক্যান করা হবে। ৪. স্লিপ সংগ্রহ: বায়োমেট্রিক দেওয়ার পর অফিস থেকে আপনাকে একটি ডেলিভারি স্লিপ দেওয়া হবে। এই স্লিপটি অত্যন্ত যত্ন সহকারে রাখবেন।
কিছুদিন পর আপনার আবেদনটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হলে আপনি মেসেজ পাবেন। এরপর ডেলিভারি স্লিপ দিয়ে আপনার স্মার্ট এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন বা স্লিপ নম্বর দিয়ে অনলাইনে এনআইডি কার্ডের কপি ডাউনলোড করতে পারবেন।
কিছু জরুরি পরামর্শ
-
আবেদনের সময় কোনো তথ্য ভুল হলে ভবিষ্যতে তা সংশোধন করা অনেক ঝামেলাপূর্ণ। তাই সাবমিট করার আগে বারবার তথ্যগুলো মিলিয়ে নিন।
-
আপনার জন্ম সনদ ও শিক্ষা সনদে নামের বানান ও জন্ম তারিখ যেন একই হয়।
-
দালাল বা কোনো অবৈধ উপায়ে ভোটার হওয়ার চেষ্টা করবেন না, এটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
Share
What's Your Reaction?
Like
0
Dislike
0
Love
0
Funny
0
Angry
0
Sad
0
Wow
0